সূচীপত্রে লেখকের নামে ক্লীক করুণ~
৩০.৫.১৬
হিমঘড়ি
তোমাকে সর্বস্ব জানি
দুটি হাত চেয়েছে অস্থির
বেজেছে বসন্ত বায়ে
পশু পালকের ছেঁড়া প্রান
আমার স্মৃতির আয়ু
বাতাসে ভেসেছে , গতি ধীর
সতর্ক রূপের অগ্নি
চাইছি তোমাকে , মহাজন
পশ্চিমবঙ্গ
কৃষ্ণকলি
কৃষ্ণকলিকে আমি দেখেছি , না ময়নাপাড়ার মাঠে নয় ,সবুজ ঘাসের চাদরে নয়
তাকে দেখেছি অভিশপ্ত প্রযুক্তি নগরীতে বাষ্পীয় দানবের গুহার মধ্যে
কৃষ্ণকলিকে আমি দেখেছি , না পাখীদের কলরবে নয় ,মেঘবালিকার খেলায় নয়
তাকে দেখেছি গনগনে বাস্তবের রোদে পুড়ে যাওয়া কঠিন জমিতে |
তার পরনে তখন জংলাপারের শাড়ি ছিলনা , শিথিল কবরীতে করবীর রাগ ছিল না
যেটা ছিল সেটা সস্তা সুতোয় বোনা এক দুয়োরানীর ্রুপকথা
যেটা ছিল সেটা তেল চটচটে চুলে হেরে যাওয়ার মিথ্যে লড়াইটা
যদিও ঠোঁটের কোনে তখনও লেগে থাকা আলগা শৈশব বোধহয় হার জিতের ভেদাভেদ বোঝেনি
অস্ত্য গামী সারল্য তখনও শেষ হাসিটা হেসেই চলেছে , দিবা রাত্রির প্রভেদ ঠিকঠাক চিনে নিতে শেখেনি |
আমি তাকে চিনেছি , চিনেছি যখন চারিদিকে একরাশ কেরানীর অর্থনৈতিক পরাধীনতার বিদ্রোহী চিৎকার
তাকে একবার দেখেই বুঝেছি , বুঝেছি মধ্যবিত্তের দৈনন্দিন আবেগের বেচাকেনা গুলোর মাঝে
যেখানে রোদ্দুর বলতে কাঁচা পয়সার ঝলকানি , মেঘের অর্থ ক্ষুধার্তের হাহাকার |
সে কিশোরী নয় , যুবতীও নয় , বার্ধক্য আসতে এখনও অনেক যুগ বাকি
তবে কি সে নারি?কিন্তু তাই বা বলি কি করে , নারী তো কেবল সে শুধু শরীরে
অন্তরের বিরাজমান বালিকাটাকে অতো কোলাহলেও বাড়বার চোখে পড়েছিল
বাইরে তখন কড়া রোদ , তবু সে ঘামেনি , ঘেমে নেয়ে হতাশার বন্যায় ভেসে যায়নি
স্বল্পায়ু স্থবিরতা ভেতরের জমে থাকা চঞ্চলতাটার গভীরতা সময়ের তুলাদণ্ডে বাড়বার মাপছিল |
কিন্তু চঞ্চল তার পিছু ছেড়েছে কই , ঠিক গুটি গুটি পায়ে এসে জায়গা নিয়েছে দারিদ্র্য মোড়া কোলে
আরেকটা শৈশব সেখানে ওঠা নামা করছিলো , অবাধ্যতায় এলো চুলগুলো আরও এলোমেলো করে দিচ্ছিল
মুহূর্তের জন্যেও মনে হয়নি , সে এর জন্মদাত্রী , বরং ফেলে আসা সরলতা যেন দশমাস দশদিন পরে
আবার ফিরে এলো , ক্ষুদ্র হাতের জগত ধরতে চাওয়ার চেষ্টাগুলো অনেক চেনা শতাব্দী প্রাচীন
দীর্ঘকাল ধরে ওরা এই ব্যর্থ চেষ্টাটা করেছে , কখনও জেতেনি ,তাইতো ওরা আজও জন্মায়
বংশগতির ধাড়া অব্যাহত রাখার তাগিদে , প্রত্যেকবার বড় হয় আরেকবার হারতে হবে বলে |
কৃষ্ণকলি সেটা জানে , সে জানে চেতনার বিকাশ খুব অবাধ্য , বোঝালেও বুঝতে চায়না
প্রতিটা কড়া শাসনে সে নিজেকেই বাড়বার শাসন করে , এই পৃথিবীর অন্তিম উদাহরণ হয়ে
বন্ধ করে দিতে চায় এতদিন ধরে চলে আসা অভিযোজনের ধারাটা
তবু দুপাশে চলমান পৃথিবী ওরা দুজনে একটা শরীরে দেখেছে
চিন্তারা মিলেমিশে গিয়ে সরলরেখায় চলেছে ,কৌতূহল দুজনেরই , একজনের জানার আরেকজনের বোঝার
দুয়ে একে এক হয়ে একসাথে মিলিয়ে যাওয়ার , মিলিয়ে যাওয়া বিগতজন্মে , মিলিয়ে যাওয়া সদ্য পুরাতন শরীরে , মিলিয়ে কালের অতল সলিলে |
কৃষ্ণকলিকে আমি দেখেছি , নানা রুপে নানা ভাবে , কতগুলো অপলক মুহূর্তে
কৃষ্ণকলিকে আমি বুঝেছি তার না বলা কথায় , জীর্ণ অবয়বের প্রতিটা ভঙ্গিমায়
ধূসর রঙ্গিন সিঁথির অন্তিম শিথিলতায় , শুধু রচয়িতা অনুপস্থিত , অনেক খুঁজেছি
কিন্তু সে ছিল না , তার দায় কেবল জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে ,সেখানে সে সঠিক , সফল
জ্বলন্ত উদাহরণ টা আরও বেশি করে জ্বলে উঠে সেটা বারংবার বলেছে
তার দায় শৈশব কে টেনে হিঁচড়ে বাড় করে নিয়ে এসে সজোরে আছাড় মারা
শাসনের উজ্জ্বল দাগগুলো সেদিন যেনও আরও বেশী করে আলোকিত হয়েছে |
কালের গতিতে এসময়ও শেষ হয় , তারা দুজনে একজন হয়ে ফেরার রাস্তা ধরে
জানি কোনও সবুজ ঘেরা গ্রাম কোথাও অপেক্ষা করছেনা ,হয়তো কোনও মিথ্যে উপনিবেশে
আবার তাকে হারিয়ে যেতে হবে , মুহূর্তের আবেগগুলো সেখানে বাড়বার ভাঙবে
বিষাক্ত দংশনে মৃত্যু হবে নিষ্পাপ কলিগুলোর , পড়ে থাকবে শুধু কাঠের গুঁড়িটা
কৃষ্ণকলি আবার হয়তো হারবে , অনেক দূরে কোনও নাম না জানা শ্মশানে শেষ হাসি হাসবে
নিষ্ঠুর বাস্তবের অশ্লীল উচ্ছ্বাসটা ............।।
পশ্চিমবঙ্গ
২৯.৫.১৬
আচম্কা চুমু
নিশ্চল ট্রেন
বগি ভর্তি মানুষ
আইফেল টাওয়ারের মত দাঁড়িয়ে তুমি।
আমি বসে
জমে বরফ হয়েছি
দু-ঠোঁট আঠা দিয়ে লাগানো নিশ্চুপ:বসে আছি। কতক্ষণ,জানিনা।
আচম্কা তুমি
শিকারি বাঘিনীর মত
আমার ঠোঁটে ঠোঁট লাগিয়ে চুমু খেলে:বগি ভর্তি মানুষ ঝিরি ঝিরি বাতাসে উড়ন্ত নিশানের মত:কাঁপছে আমার দেহ।
কিংবা মৃদু ভূমিকম্প। মোনালিসা'র হাঁসি তোমার ঠোঁটে দুষ্টু,এভাবে কেউ চুমু খায়?
তোমার আচম্কা চুমুর প্রতিবাদ
বেঁচে থাকবে:কবিতার মাঝে অপরাজিতা।
বাংলাদেশ
তুমি তো চলে গেলে
(কামদুনির নির্যাতিতা কন্যার স্মৃতির উদ্দেশে )
সুসভ্য মানব জাতীর অসভ্য নখরাঘাতে
রক্তাপ্লুতা হে বীরাঙ্গনা
তুমি তো চলে গেলে।
ছিন্ন ভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের নিদারুন যন্ত্রনা –
অবমানিত তোমার নারীত্বের মাধুর্য -
এসব-ই সহ্য করে
এ সব এর সাথেই লড়াই করে
তুমি তো চলে গেলে
সব যন্ত্রনার ঊর্দ্ধে,
আর ছড়িয়ে দিয়ে গেলে সেই যন্ত্রণা
শত কোটী মানুষের মণে।
তোমার নিঃশব্দ চলে যাওয়ার
সশব্দ দামামা ধ্বনিতে
লজ্জায় অবনত শতকোটী মাথা।
অপদার্থ দ্বিশতকোটী বাহু
অসমর্থ তোমার সম্ভ্রম রক্ষায়।
ইশ লজ্জা – বড় লজ্জা ।।
হে বীরাঙ্গনা
তোমার যুদ্ধক্লান্ত মুখের ছবি
জাগরিত থাক আমার হৃদয়ে অনিবার,
আগুনে ঘৃতাহুতির মত
পাশবিকতার বিরুদ্ধে জ্বালুক দাউ দাউ আগুন।
ছড়িয়ে পড়ুক সেই আগুন দাবানলের মত
ধ্বংস করুক, জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করুক
মুনুষ্য নামধারী সমস্ত পাশবিকতা কে।।
হে বীরাঙ্গনা
তোমার যন্ত্রনাকাতর মুখ,
তোমার অসহায় আর্তস্বর,
তুলুক নিনাদ মানুষের মনে।
নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে উঠুক রনভেরী
শেষ হোক এই পাশবিকতার মহামিছিল।।
হে বীরাঙ্গনা
আগামী দিনের সেই শুভদায়ক যুদ্ধে
তুমি-ই তো হবে সেনাপতি,
কলি যুগে অসুর দলনে তুমি-ই তো মা দুর্গা।।
তাই হে বীরাঙ্গনা
তমি তো আমার ও কন্যা
তবুও আমি তোমায় প্রনাম করি।
তোমার যাত্রা সুগম ও ত্বরান্বিত হোক।।
পশ্চিমবঙ্গ
২৭.৫.১৬
কথা তো এই ছিল না
আমারতো জন্ম হয়েছিল শিশু হয়ে
ঘাস, মাটি, পাথর, আকাশকে নিয়ে খেলবো বলে ।
তোমরা তুলে দিলে আমার হাতে
জটিল স্মার্টফোন ।...
ফলে হয়ে উঠলাম আমি -
জটিল, স্মার্ট...
অনেকে তো ইদানিং
যন্ত্রও বলছে ।
অথচ কথা তো ছিল
ঘাসের মত সবুজ হওয়ার,
মাটির মত খাঁটি,
পাথরের মত সমর্থ,
আকাশের মত বিশাল আর
এদের সবারই মত সরল হওয়ার ।
ত্রিপুরা
সুখ সুখ বিবৃতি
একদা সুখগুলো চলচ্চিত্র হতো
জীবনবোধের উপখ্যানে।
সুখগুলো পরিধেয় টিশার্টের
খাঁজে মুদ্রিত থাকতো
জীবনে থেকে জীবনে।দেহান্তরের সান্নিধ্য পেলে আস্তাকুঁড়ে
যেতো লজ্জাবনত অন্ধকার,
নৈপুন্যতায় গেঁথে থাকতো
জোসনামাখা রাত,
আর শরতমুখি হওয়া দিনসমূহ।বিবিধ গল্পের ফাঁকে সুখগুলো
হারিয়ে গেলে লিপিস্টিকের রঙ
বিবৃতি দেয় পাল্টে যাবার।বাংলাদেশ
২৬.৫.১৬
কালাগৃহ
হৃদয় ঘেঁটেঘুঁটে কি দেখতে চাইছো?
সময়ের কামড়ে কতটা রক্তাত্ব আমি,
ক্যানভাসজুড়ে খুব মেঘ,পাশবিক বৃষ্টিতে ধর্ষন চিহ্ন অবিকার
বলেছি ধুম বৃষ্টি হতে পারে, ফিরে যাও আলোর বাতিঘরে
আনাড়ি বালকের ঘর ছাড়তে নেই!
নিরহ বালিকার প্রেমে পড়তে নেই,
কালো বিদ্যুৎ চমকায় দৃষ্টির জানালায়
পূবের আকাশে রংধনু দ্যাখো লাল নীল ভুলে গেছে
ভয় কেটে গেলে একটা সময় সেও সমুদ্রে নেমে পড়বে
অসংখ্য নষ্ট জীবনচিত্রের ছোপ ছোপ দাগ তার বক্ষাভ্যন্তরে!
একটা নয় দুটো নয় ঝাঁকঝাঁক অস্পষ্ট নগ্ন হিস্রতার
প্রত্নতাত্ত্বিক ছাপ লেগে আছে মানচিত্রের ডানায় ডানায়,
টেরাকোটার পোড়া মাটির ফলকের মতো ছলনার
কিছু চাপা পড়া ইতিহাস, কিছু কলঙ্কিত অধ্যায়!
কুৎসিত বাসনায় গড়ে তোলে নকল নগরী গোপন দালান কোঠাহারিয়ে যাওয়া মানুষ আজও রয়ে গ্যাছে কালাগৃহে,
হয়তো বা ফিরবে না আর। তবুও হৃদয় খুঁড়ে তোল
কোমল কুমারী শরীরে দু'নম্বরি প্রেম আঙুল চালিয়ে করে দগ্ধ বিদগ্ধ!
আগুনের মত জ্বলজ্বল করে জ্বলুক বৃষ্টির সিকোয়েন্স
পাশবিক এই অন্ধকারে পুড়ে যাক সাদা কালো মেঘ, ওম স্বহা!
কালচে জগতে তুমুল বৃষ্টির দরকার লাল মেঘের গর্জনে
সে ধুয়ে দেবে অপমান পোড়াবে ধর্ষিত অশ্রুবিন্দুযারা আলো নিয়ে জুয়া খেলে,
অপমানে পৃথিবী কাপিয়ে ঘৃন্য সাবল চালায় হিংস্রতায়
বলে এনেদিব ইনসাফ,বরং মুখোশ পড়ে সেই খুণ করে বিশ্বাস
ভয়াল কালো সন্ধ্যায় ওসব নিদর্শনে তোমার কাজ নেই।
তুমি তো চিরকালই বহির্মুখী এবং বহুগামীই ছিলে
তবে ভয়কি আইনী পোশাকেই ভোঁচালিতে পুরে দিক বুলেট যত!একদিন আগুনে পুড়বেই হিংস্র জানোয়ারের ভয়াল থাবা, ওম স্বহা!
সেদিন ঝুম বৃষ্টি হবে পৃথিবীজুড়ে, ফিরে আসবে ন্যায়ের করুণাধারা।
বাংলাদেশ
চিরসবুজ ( অনুগল্প )
পাখি ও সবুজ ২ বছর প্রেম করার পর বিয়ে করল।আজ ওদের ৭ম বিবাহ বার্ষিকী।দুজনেরই পরিবার,বন্ধুরা নিমন্ত্রিত এখানে।দুজনকে দেখে মনে হয় সময় কোনওভাবেই ওদের প্রেমে নিজের স্বাক্ষর রাখতে পারেনি।ওরা এখনও এতটাই নতুন।সত্যি খুব হিংসে হয়, দুবছরের সংসারেই হাঁপিয়ে উঠেছি আমি।আর ওরা দুজন এখনও" চির সবুজ "।পাখি আমার ছোটবেলার বান্ধবী।কৌতুহল বশতঃ তাই এই চির সবুজ প্রেমের রহস্যটি ওকেই জিজ্ঞেস করে ফেললাম।প্রথমে ও একটু এড়িয়ে যাচ্ছিল ,পরে অতিথিরা চলে যাওয়ার পর আমাকে ডাকল আর, একজন মহিলার ছবি দেখাল আমাকে।মহিলাটি পাখির থেকে মোটেও সুন্দর নয়।জিজ্ঞাসা করতে পাখি বলল, "ওই মহিলার সাথে আমার স্বামীর একটি অবৈধ সম্পর্ক আছে আজ ৪ বছর যাবৎ ।আমি জেনেও ওকে ছাড়তে পারিনি ,কারণ বাড়ীর অমতে বিয়ে করেছিলাম ,তাই বাড়ির লোককে কোনমুখে বলব এ কথা।তাই ঠিক করেছি মুখোশ পরে এই চির সবুজ প্রেমের খেলাটাই নিয়ম করে খেলে যাব।এ বয়সে বুড়ো বাবা-মাকে কষ্ট আর নাইবা দিলাম।"
পশ্চিমবঙ্গ
এই বেশ আছি
নিঃস্বতার সংজ্ঞায় পুরোটাই নিজের নাম লিখি ,
আড়ম্বরের চাকচিক্যে ছেঁড়া জীবনঢাকা পড়ে যায় নিত্যতোমার সুখের বাড়-বাড়ন্তে নিয়ম করে চোখ বুজে থাকি,ভয় পাই যদি ভালবেসে ছুঁয়ে দিই ,
যদি তোমার অভ্যাসে আরেকবারনিজেকে মিলিয়ে দিই,
পারবো না আরস্বপ্নের অলীক খেলায়নিঃস্বতার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে।
তারপর !
অভিসারের পর অনেকক্ষন সারা শরীরে শুধু তোমার গন্ধ লেগে থাকে,
বলতে পার,মুহুর্তেরা চলে গিয়েও ফিরে আসে।
কিছু আগন্তুক নির্দ্বিধায় গৃহস্থের উপকার করে আতিথেয়তা অস্বীকার করেচলে যাওয়ার পর মেঝেতে যে মন লুটিয়ে পড়ে,
তার আঁচলে বেঁধে রাখা কুড়িয়ে আনা ফল,
মনের কাছে অনেকটা -বয়স্ক ক্ষেতে ক্ষনজন্মা ফসল ।
পশ্চিমবঙ্গ
কেন
একবারি এসেছিলে কেন ?
নীলকাশের ওপার থেকে সন্দিগ্ধচিত্ত নীরবে
চপলা কাজল চোখে ভ্রমরের ধ্রুবতারা স্পন্দ
কটিতটে বজ্রাহত ক্ষীয়মান কায়া. |
বেহাগে বাজে না বাঁশি উদয় রাঙা নিষ্কম্প সুমিল অধরে
ধুপছায়া করাঘাতে মৃণালের বিজয়ী স্মরণকথা ভেবে |
বাংলাদেশ
কলঙ্ককথা
আসতে হবে কাছে
বা. বাসতে হবে ভাল
যদি. নাই বা মানি এসব ?
যদি. হাঁসের ডানার বাঁকে
ছেঁড়া. পালক ওড়ার ফাঁকে
আমি হারাই শৈশবে. ?
তবে. চিকন চুলের রাশে
কিছু. শিউলী কিছু কাশে
তুমি কলঙ্ক তো খোঁজ?
আমি কলঙ্কিনী রাই
রাখি বাঁশের চিতায় তাই
আমি কলঙ্কেরই শব
পশ্চিমবঙ্গ
দু'টি কবিতা
এক
শাদা বিছানা , সমাজ সমাজ-
রক্তের দাগ । পূর্ণ তৃপ্তি স্বামীবন্ধুটি ।
আটপৌড়ে যৌবনে সন্তান কিনা যায়
সতীত্ব অর্জন করা যায় হাতছাবি ,
কি মুস্কিল ব্যপার-
যুবতীদের সতিত্বের পরীক্ষা
মহিলাদের মা হবার পরীক্ষা
রীতিমত জেঁকে বসেছে শাদা বিছানায় ।
বনের পর বন , অন্ধকারের পর অন্ধকার
আলোর পর চোখ ঝাপসা উলঙ্গ শরীর , বাঁচা স্বার্থক ।
ভৃগু দাদুকে বলতে দেখেছি,
আরে মশাই ,ছিঃ ছিঃ !চরম নৈরাজ্য । শরীর আর শরীর নেই ।
হায় শাদা বিছানা , কার জন্য এত
ধুলাই , সযত্নের শরীর ।
ভৃগু দাদু হাত তুলে তোমার ঈশ্বরকে বলো , শাদা বিছানা হতে চাই পরজন্মে । সতীত্বের নক্সা সূচ-সুতোয় ডাল-পালা এঁকে ।
দুই
বিষ্টি , মেঘকে -
আমি বিশ্বাস.করি না ;
আমাকে দাঁড়িয়ে রেখে ভিজিয়ে-
দেওয়া তার রোজকার ব্যস্ততা ঃ
মাটি মরে গেছে কাঁদার নরমে
মানুষের ছায়া , মেঘের মৃগনাভীতে একসা ;
কতটুকু দিয়ে যাব , জানিনা ,
হিসেব করে পাবার সম্ভবনা কম ,
অন্তর্জলী প্রতীক্ষা স্বেচ্চাচারী চণ্ডাল-
ঘাড়ের কাছে দাঁড়িয়ে ঃ
বিশ্বাস নিয়ে , আত্মবিশ্বাস-
ফিরানো যায় না , বুঝতে পারি ;
গোপন মমিতে বুক পেতে জন্মান্তর খুঁজি
ছায়ার গোলায় আলোর ভঙ্গুর
আসে মন্দ , যায় ভাল ; নৈঋত বাড়িতে-
মানুষের আত্মবিশ্বাস , শেষ দুপুর ,
বাস্তুসাপ খোলস ফেলে যা়য়
মৃত্যুবাচক শব্দের পিঠে. ঃ
পশ্চিমবঙ্গ
অদ্বৈত মল্লবর্মন ও ' তিতাস একটি নদীর নাম
অদ্বৈত মল্লবর্মণ বাংলা সাহিত্যের একজন বিশিষ্ট ঔপন্যাসিক তার লেখা উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম' এমন একটি সফর সৃষ্টি যা লেখককে বাংলা সাহিত্যের উপন্যাসের ধারায় একটি মর্যাদাপূর্ণ আসন দান করেছে। আঞ্চলিক জীবন অবলম্বনে লেখা উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে বিরল নয়। কিন্তু ‘তিতাস একটি নদীর নাম' উপন্যাসে লেখক যে জীবন সংশ্লিষ্টতার আন্তরিক পরিচয় দান করেছেন একটি সম্প্রদায়ের বাস্তব চিত্র। এ উপন্যাসে লেখকের ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যও ফুটে উঠেছে। এখানে জীবনকে খুব কাছে থেকে দেখার বাস্তব অভিজ্ঞতা আশ্চর্য নির্লিপ্ততার সাথে রূপায়িত হয়েছে। জীবনের সঙ্গে এই নিবিড় সম্পর্কের কারণে উপন্যাসটি হয়ে উঠেছে আকর্ষণীয় ও আদরনীয়। যা লেখককে তার স্বল্পসংখ্যক সাহিত্যকীর্তি সত্ত্বেও স্থায়িত্ব দান করেছে। অদ্বৈত মল্লবর্মণের জীবন প্রবল প্রতিবন্ধকার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে এই মহান সাহিত্য সাধকের জন্ম ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের কাছেই তিতাস নদীর তীরের গ্রাম গোকর্ণঘাটে ১ জানুয়ারি ১৯১৪ সালে। তার পিতার নাম ছিল অধরচন্দ্র মল্লবর্মণ। লেখাপড়া করার অনুকূল সুযোগ তার ঘটেনি। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণীতে ভর্তি হলেও সেখান থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল। তারপর অল্পদিনের কর্মময় জীবন অতিবাহিত হয়েছে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করে।
অদ্বৈত ১৯৩৪ সালে মাসিক ত্রিপুরা পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতা শুরু করেছিলেন। মোটকথা, ১৯৩৪ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত এই দীর্ঘ ১৬ বছর অদ্বৈত মল্লবর্মণ তার সাংবাদিক জীবনে যুগপৎ সাহিত্য ও সাংবাদিকতার অসাধারণ সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হন। কলকাতায় তার কর্মজীবনে লেখালেখিতে সময় কেটেছে। অত্যন্ত অভাব-অনটন, রোগ-শোক, দুঃখ-দারিদ্র্য তার জীবনের নিত্যসঙ্গী ছিল। এর ফলে নিরবচ্ছিন্নভাবে নির্ভাবনায় সাহিত্য ধারা অক্ষণ্ণ রাখা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। তার বাতিক ছিল বইপত্র কেনার এবং গরীব আত্মীয়-স্বজন, চেনা-জানা লোকদের অর্থ সাহায্য দান করা। কলকাতায় নিজের সীমিত রোজগার থেকে মালোপাড়ার শিশু-কিশোরদের ঘরোয়া বিদ্যালয় পরিচালনার জন্য তিনি উপেন্দ্রবাবুর স্বল্পশিক্ষিত বিধবা প্রফুল্লকে নিয়মিত অর্থ প্রেরণ করতেন। তিতাস পাড়ের যেসব মালো ও অন্যান্য পরিবার আশ্রয় নিয়েছিল তাদের যথাসাধ্য দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ। যেজন্য তার বন্ধুরা বলেন, ‘আমরা চিরকাল অদ্বৈতকে তাহার মুষ্টি অন্য বহুজনের সঙ্গে ভাগ করিয়া খাইতে দেখিয়াছি।' যা তিনি উপার্জন করতেন তা এসব জনহিতকর কাজে ব্যয় করতেন। নিজেকে ভাল করে ভরণপোষণের সুব্যবস্থা তার ছিল না। ফলে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে জীবনের অবসান ঘটে। এই মহান সাহিত্যিক ১৯৫১ সালের ১৬ এপ্রিল নারকেলডাঙ্গার ষষ্ঠীতলার বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। অদ্বৈত মল্লবর্মণের মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্য হারিয়েছে একজন সাহিত্যরত্ন।
সাহিত্যকীর্তি হিসেবে ‘তিতাস একটি নদীর নাম' উপন্যাসের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। উপন্যাসের এই শ্রেষ্ঠত্ব নির্ভর করছে এর বিষয়বস্তু নির্বাচনে, চরিত্র-চিত্রণে এবং এর প্রকাশভঙ্গি তথা ভাষায়। লেখক যেন নিজের জীবন থেকে এর কাহিনী নির্বাচন করেছেন। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট সাহিত্যিক তিতাশ চৌধুরী, তার লেখা অদ্বৈত মল্লবর্মণ ও অন্যান্য প্রবন্ধ নামক গ্রন্থে বলেছেন, ‘এই বৈশিষ্ট্য অদ্বৈত মল্লবর্মণ নিজেই তাঁর উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম' এ নির্মাণ করেছেন বলে আমার মনে হয়। ........পৃথিবীর সাহিত্যের ইতিহাসে অন্ত্যজ শ্রেণী থেকে উঠে আসা স্বশিক্ষিত ও সুশিক্ষিত গাল্পিক ও ঔপন্যাসিক অদ্বৈত মল্লবর্মণের মতো আর কেউ আছেন বলে আমার জানা নেই। সেজন্যই তাঁর উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম' স্বকীয় বৈশিষ্ট্য উজ্জ্বল। এর সঙ্গে কারো উপন্যাসই মেলানো যায় না। গল্পও। তিনি যাদের মধ্য থেকে বড় হয়েছেন তাদের কাহিনী নিয়েই উপন্যাসের ঘটনাবলি সাজানো হয়েছে। তিতাস নদীর তীরে জেলেদের গ্রাম। সে গাঁয়ে তারা যুগ যুগ ধরে বসবাস করে। তাদের জীবিকা আসে তিতাসের বুক থেকে। তবে সে যাই হোক না কেন, ‘তিতাস' যে পৃথক একটি সত্বা-পৃথক একটি ‘কঠিন বাস্তব ছাঁচে বানানো অপরূপ শিল্পিত জীবন গাঁথা', তা এককালের অদ্বৈতর সতীর্থ অধ্যাপক সুবোধ চৌধুরীর ভাষ্যেও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, ‘আমি তিতাস দেখেছি। আমি সমুদ্র দেখেছি, পাহাড় দেখেছি। অনেক বিচিত্রতর মানুষের সঙ্গে মিশেছি। কিন্তু অদ্বৈত মল্লবর্মণের ছিল মানুষ সম্পর্কে সুগভীর Insight, এমনটি আমাদের ছিল না। আমরা দেখেছি, দর্শকের মতো, ভালো হয়তো লেগেছে। তবে অদ্বৈত দেখেছেন শিল্পীর চোখে। তাঁর সত্তার সঙ্গে তিতাস ছিল মিশে। এটা পৃথক করতে পারেননি তিনি, চানও নি। তার উপর ছিল উদার দৃষ্টিভঙ্গি।..........প্রথম যখন পান্ডুলিপি জমা দিয়েছিলেন, আমি বলেছিলাম মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখলেন ‘পদ্মা নদীর মাঝি' আর কি তোমার বই নেবে? বলেছিলেন অদ্বৈত সুবোধা, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বড় Artist, Mast
artist কিন্তু বাওনের পোলা রোমান্টিক। আর আমি তো ‘জাউয়ার পোলা' আর কিছু বলেননি। পরিচয়ের এই প্রত্যক্ষতাই ছিল তার গৌরবের ভিত।' মাছ ধরে নৌকা বেয়ে জেলেদের জীবন অতিবাহিত হয়। জীবিকার জন্য লোকেরা পরিশ্রম করলেও তারা প্রাচুর্যের মুখ দেখে না। অভাব-অনটন তাদের জীবনের নিত্যসঙ্গী। এই দুঃখ দারিদ্র্যপূর্ণ জীবন আসে প্রেম ভালবাসায়। সেখানেও নিরবচ্ছিন্ন সুখ খুঁজে পাওয়া যায় না। সংসার জীবন কাটে দুঃখ দারিদ্রে্য। বেশ কয়েকটি চরিত্রের মাধ্যমে লেখক সেই দৈন্য পীড়িত কাহিনীর রূপ দিয়েছেন। এতে যে কষ্টের জীবন তাও নির্বিঘ্ন থাকে না। প্রাকৃতিক নিয়মে এক সময় নদীতে চর পড়ে যায়। নদী যায় শুকিয়ে। শেষ হয়ে যায় নদীর যৌবন। শেষ হয় নদীর মাছ ও ঢেউতরঙ্গ। নিরুপায় হয়ে জেলেরা তখন বেঁচে থাকার তাগিদে তাদের যুগ যুগান্তরের আবাস ছেড়ে জীবিকা সন্ধানে অন্যত্র চলে যায়। এভাবেই কেউ কেউ আর কোনো উপায় না পেয়ে সেখানেই থেকে যায়। তাদের তখন দুঃখের শেষ থাকে না। এ যেন এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। একান্ত অসহায় সেইসব মানুষের কাহিনী রূপায়িত হয়েছে, ‘তিতাস একটি নদীর নাম' উপন্যাসে। এ সম্পর্কে অদ্বৈতর জীবনীকার অধ্যাপক শান্তনু কায়সারের মূল্যায়ন ও বিচার উপেক্ষণীয় নয়। তিনি বলেন, ‘তিতাস জীবনের শেকড় প্রাকৃত জীবনের গভীরে প্রোথিত। এই প্রাকৃত জীবনকে বাইরে থেকে যতই সরল দেখাক এর ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যাবে, তা বহু ভঙ্গিম বৈচিত্র্যের অধিকারী। সারল্যের মধ্য দিয়ে এই বৈচিত্র্যের অনুসন্ধান করেছে ঔপন্যাসিক ‘তিতাস একটি নদীর নাম' উপন্যাসে। ফলে নদীকেন্দ্রীক বাংলা সাহিত্যের উপাদানসমূহের মধ্যে অন্য যে উপন্যাসটি প্রাকৃত জীবনকে ধারণ করেছে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই ‘পদ্মা নদীর মাঝি'র সঙ্গে তুলনা করলেও ‘তিতাস একটি নদীর নাম' অনন্য হয়ে উঠে। প্রায় একই সুর লক্ষ্য করা যায় বিপ্লব চক্রবর্তীর কণ্ঠেও। তিনি বলেন ‘তাকষি শিবঙ্কর পিল্লাই এর ‘চিংড়ি' সমরেশ বসুর ‘গঙ্গা' ও অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম' (এবার থেকে তিতাস) তিনটি বিশিষ্ট ভারতীয় উপন্যাস। মালয়ালম ভাষায় লেখা ‘চিংড়ি', কেরলের সমুদ্র উপকূলের পটভূমিতে লেখা এক অনবদ্য রচনা। অন্যদিকে ‘গঙ্গা' ও ‘তিতাস' দুটি রচনারই মূল বিষয় মৎস্যজীবীদের জীবন। সম্পূর্ণ তিনটি পৃথক পরিবেশ ও পটভূমি নির্ভর রচনা হলেও এই তিনটি রচনাতেই মৎস্যজীবীদের জীবন চর্চার সমাজতান্ত্রিক পরিচয় ফুটে উঠতে দেখা যায়। ‘চিংড়ি' ও ‘গঙ্গা'র সাদৃশ্য চোখে পড়ে বেশি এবং ‘তিতাস'-এর বর্ণনায় এইসব সাদৃশ্য সূত্র কম-বেশি থাকলেও এই উপন্যাসটি কতকগুলো নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল।' উপন্যাসের কাহিনীটি বর্ণিত হয়েছে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে। উপন্যাসে যে সমাজের কথা বলা হয়েছে লেখক সে সমাজেরই লোক। তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতা অকৃত্রিমভাবে প্রকাশ পেয়েছে। মালো সম্প্রদায়ের জীবন যথাযথ রূপায়নের যে চেষ্টা এ উপন্যাসে দেখা যায় তা অত্যন্ত বাস্তব। তিতাসের তীরবর্তী গ্রামগুলোর সবুজ আল সবুজের ছড়াছড়ি এ পাকা ধানের মাদকতাময় গন্ধ আমাদেরকে নিয়ে যায় ভিন্ন এক জগতে। ফুটে ওঠেছে গ্রামের সহজ-সরল মানুষের প্রতিচ্ছবিও। সাধারণ মানুষের কাহিনী হিসেবে এই উপন্যাস অবশ্যই বাস্তবানুসারী যথাযথভাবে কাহিনী বর্ণনাতেই লেখকের কৃতিত্ব। চরিত্র-চিত্রণে লেখকের স্বার্থকতা সম্পর্কেও সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। ছোট-বড় অনেকগুলো চরিত্র এ উপন্যাসে ভিড় করেছে। লেখক চরিত্র-চিত্রণে যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। মালো সম্প্রদায়ের লোকগুলো বাস্তবে যেভাবে জীবনযাপন করে লেখক সেভাবেই তাদের রূপ দিয়েছেন। কিশোর, সুবল, অনন্ত, বনমালী প্রমুখ অসংখ্য চরিত্র এ উপন্যাসে স্থান পেয়েছে। প্রতিটি চরিত্রই স্ব-স্ব স্থানে স্বকীয়তায় সমুজ্জ্বল। চরিত্রগুলো রূপায়নে লেখক স্বাভাবিকতা বজায় রেখেছেন। এসব চরিত্রের মাধ্যমে মালো জীবনের যথাযথ পরিচয় পাওয়া যায়। দুঃখ-দুর্দশা, অভাব-অনটনে বিপর্যস্ত তাদের জীবন। জীবিকা উপার্জনের পথ তাদের সংকীর্ণ। এর মধ্যেই নিদারুণ কষ্টে তাদের জীবন অতিবাহিত হয়। পরম ধৈর্য্যের সঙ্গে জীবনের কষ্টগুলোর সাথে তারা লড়াই করে। বিভিন্ন মত-পথ, ধর্ম-বর্ণের লোক গ্রামে বসবাস করে। তাই বলে তাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতির কোনো অভাব নেই। ধৈর্য্যশীল এসব মানুষ জীবনের সঙ্গীকে স্বাভাবিক বলে গ্রহণ করেছে। সমাজচিত্র হিসেবে উপন্যাসটি বিশেষ গুরুত্বের অধিকারী। তিতাস নদীর তীরবর্তী মালো সম্প্রদায়ের যে জীবন এ উপন্যাসে উপস্থাপিত হয়েছে তা একান্ত কৃত্রিমতা রহিত। লেখকের প্রকাশভঙ্গি নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। যে জীবনচিত্র লেখক অঙ্কন করেছেন তাকে বাস্তবানুগ করার জন্য যথোপযুক্ত ভাষাও প্রয়োগ করেছেন। চরিত্রগুলোর মুখে সেসব আঞ্চলিক ভাষা দেয়া হয়েছে তেমনি যথাযথ পরিবেশ বর্ণনার জন্য আঞ্চলিক শব্দ প্রয়োগ করা হয়েছে। লেখকের বর্ণনার ভাষায় কোনো জটিলতা নেই। বর্ণনার দুরূহতা দূর করার জন্য তিনি চেষ্টা করেছেন। সহজ-সরল ভাষা ব্যবহার করায় উপন্যাসটি সুখপাঠ্য হয়েছে।
স্বাভাবিক ভাষা প্রয়োগে উপন্যাসটি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। ‘তিতাস একটি নদীর নাম' উপন্যাসটি একটি আঞ্চলিক জীবনচিত্র হিসেবে সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই উপন্যাস সম্পর্কে ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল মন্তব্য করেছেন, ‘কেবল একটি উপন্যাস রচনা করেই শ্রী অদ্বৈত মল্লবর্মন বাংলা সাহিত্যে স্মরণীয় হয়ে আছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্তর্গত গোকর্ণ গ্রামের ধীবর সম্প্রদায়ের জীবনচর্চা তাঁর ‘তিতাস একটি নদীর নাম' গ্রন্থে যে-আন্তরিক মমতায় রূপায়িত হয়েছে তার তুলনা বাংলা সাহিত্যে খুব বেশি নেই। দরিদ্র ধীবর পরিবারের সন্তান অদ্বৈত মল্লবর্মন তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সুগভীর অন্তর্দৃষ্টির বলে এক উপেক্ষিত সমাজের জীবন সংগ্রামের কাহিনীকে দিয়েছেন অবিনম্বরতা।' এ সম্পর্কে সুমিতা চক্রবর্তীর কথা একটু স্মরণ করা যায়। ‘অদ্বৈত মল্লবর্মনকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একেবারে অবহেলিত বলা যায় না। একটিমাত্র উপন্যাসের সুবাদে (শোনা যায় আরো একটি বা দুটি উপন্যাস লিখেছিলেন কিন্তু সম্ভবত(?) তা পাওয়া যায়নি এখনও) তাঁর স্থান সংরক্ষিত হয়েছে মহৎ সাহিত্যিকদের সারিতে।'
ঔপন্যাসিক অদ্বৈত মল্লবর্মন তাঁর অমর সৃষ্টিকর্ম ‘তিতাস একটি নদীর নাম' নামক উপন্যাসের জন্য বাংলা সাহিত্যে অনন্য হয়ে আছেন। সেজন্য বাংলা উপন্যাসের জগতে একটা স্থায়ী আসন পেতে বসে আছেন। পরিশেষে একথা বলা যায় যে, অদ্বৈত মল্লবর্মন ছিলেন বাংলা সাহিত্যাকাশের মিটমিট করে জ্বলা এক উজ্জ্বল তারকা।